সৈয়দ আবদাল আহমদ | সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাক্ষাত্কার

আলাপচারিতা : অধ্যাপক নজরুল ইসলাম : ঢাকায় প্রতি বছর পাঁচ লাখ করে লোক বাড়ছে

সৈয়দ আবদাল আহমদ

০৩, ফেব্রুয়ারী ২০১২




ঢাকায় প্রতি বছর যে জনসংখ্যা বাড়ছে, তা দিয়ে মালদ্বীপের মতো একটি নতুন দেশ হয়। তেমনি প্রতি ১০ বছর পর সিঙ্গাপুরের মতোও একটি দেশ করা যায়। রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার জনসংখ্যা গড়ে প্রতি বছর বাড়ছে ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে। আর বস্তির জনসংখ্যা বাড়ছে গড়ে ১০ শতাংশ হারে। প্রখ্যাত নগর গবেষক, ভূগোলবিদ ও ঢাকা নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম দৈনিক আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার পর ঢাকা নগরীর উত্থান, বিশেষ করে গত ৪০ বছরে এই নগরীর পরিবর্তন সম্পর্কে মূল্যায়ন করে এ অনুভূতিই ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সৈয়দ আবদাল আহমদ।

ঢাকা নগরীতে প্রতিবছর পাঁচ লাখ করে লোক বাড়ছে। এই জনসংখ্যা দিয়ে প্রতিবছর মালদ্বীপের মতো একটি নতুন দেশ হয়। তেমনি প্রতি ১০ বছর পর সিঙ্গাপুরের মতোও একটি দেশ করা যায়। প্রখ্যাত নগর গবেষক, ভূগোলবিদ এবং ঢাকা নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। দৈনিক আমার দেশ-এর সঙ্গে এক আলাপচারিতায় তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণহারে বাড়ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার জনসংখ্যা গড়ে প্রতিবছর বাড়ছে ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে। আর বস্তির জনসংখ্যা বাড়ছে গড়ে ১০ শতাংশ হারে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার পর ঢাকা নগরীর উত্থান বিশেষ করে গত ৪০ বছরে এই নগরীর পরিবর্তনটা কী হয়েছে—নগর গবেষক হিসেবে অধ্যাপক নজরুলের সামগ্রিক মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তব পরিস্থিতির উল্লেখ করে ঢাকার সর্বশেষ একটি চিত্র বর্ণনা করেন। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, রাজধানী নগরী ঢাকার জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকহারে। এমন পরিবর্তন নাইজেরিয়া এবং থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও হয়নি। স্বাধীনতার পর ঢাকা নগরীর জনসংখ্যা বারো-তেরো গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক দশমাংশ লোক ঢাকায় বসবাস করে। তিনি জানান, ১৯৭১ সালে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ৯ লাখ। যে ঢাকাকে আমরা ১৯৭১ সালে চিনতাম, সেটুকু জায়গায় এখন লোকসংখ্যা ৯০ লাখ। অর্থাত্ ১০ গুণ বেড়ে গেছে। আর বৃহত্তর ঢাকা কিংবা রাজধানী বা রাজউকের ঢাকা আমরা যাকে বলি, সেই ঢাকার লোকসংখ্যা এখন পনেরো মিলিয়ন বা দেড় কোটি। লোকসংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি ভৌগোলিক বিস্তারও হয়েছে ঢাকার। আগে ঢাকা ছিল বুড়িগঙ্গা থেকে টঙ্গি খাল, হাজারীবাগ থেকে গেণ্ডারিয়া পর্যন্ত। আয়তন ছিল ৭০ বর্গমাইল বা ১৩৫ বর্গ কিলোমিটার। নারায়ণগঞ্জ, সাভার কদমরসুল, টঙ্গী ও গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে ঢাকা। রাজউকের এই ঢাকার আয়তন ১৫০০ বর্গ কিলোমিটার। ভবিষ্যতে এই ঢাকা উত্তরে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, ঢাকা নগরীর প্রকৃতি বা প্যাটার্ন এখন মেগাসিটি কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ঢাকাকে অনায়াসেই প্রাইমেসি বা দেশের ‘নিয়ন্ত্রানগর’ আখ্যায়িত করা যায়। এই নগরই দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। অবশ্য সব নগরেই জনসংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা স্বাধীনতার পর ছিল ৭০ লাখ, সেটা এখন সাড়ে ৪ কোটি। আর একা ঢাকার জনসংখ্যাই দেড় কোটি। স্বাধীনতার পর ঢাকার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক নজরুল বলেন, স্বাধীনতার পর ঢাকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে গার্মেন্ট শিল্প। আশির দশকে ঢাকায় গার্মেন্ট শিল্প পত্তনের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। গত ৩০ বছরে দেশে পাঁচ হাজার গার্মেন্ট শিল্প গড়ে ওঠে। এর মধ্যে চার হাজারই ঢাকায়। এই শিল্পে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে, যার বেশিরভাগই নারী। গার্মেন্ট শিল্পকে কেন্দ্র করে অন্যান্য পরিপূরক শিল্প গড়ে ওঠে। সমাবেশ ঘটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের। একই সঙ্গে ঢাকায় বিকাশ লাভ করে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার। এখন প্রায় এক হাজার রিয়েল এস্টেট কোম্পানি প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির ব্যবসা করছে। এই শিল্পে নিয়োজিত আছে দুই থেকে চার লাখ লোক। গত ২৫ বছরে ঢাকার জমির দামও দ্রুত বেড়েছে। বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় যত লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, তার সিংহভাগই ঢাকায়। কারখানার কাজের প্রায় ৭৫ শতাংশ লোক ঢাকাকেন্দ্রিক। এই নগরীতে চার-পাঁচ লাখ হকার আছে। ছয় লাখ ড্রাইভার আছে। চার লাখ আছে কাজের মেয়ে। রিকশাওয়ালা-ঠেলাওয়ালাসহ শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা কয়েক লাখ। অধ্যাপক নজরুল বলেন, ঢাকায় অবস্থানকারীদের ব্যক্তিউন্নতি যথেষ্ট হয়েছে। যারা বহুদিন ধরে শহরে, তাদের উন্নতি হয়েছে। একেবারে যারা নতুন এসেছে শহরে, তাদের কর্মসংস্থান কম হয়েছে। ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও তুলে ধরেন অধ্যাপক নজরুল। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি বাড়লেও ঢাকার ফিজিক্যাল গ্রোথ বা সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। একটি আদর্শ শহরে ২৫ শতাংশ সড়ক নেটওয়ার্ক থাকতে হয়। ঢাকায় আছে মাত্র ৮ শতাংশ সড়ক। ঢাকায় পরিবেশের হুমকি ভয়াবহ। নদী-খাল-বিল-জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা চারটি নদীবেষ্টিত ছিল। এখন এগুলো ড্রেনে পরিণত হয়েছে। জলাভূমিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকায় গণপরিবহনের ঘাটতিও অন্যতম সমস্যা। ঢাকা নগরীর মতো মিশ্র পরিবহন ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্য কোনো নগরীতে নেই। ঢাকায় আছে রকমারি পরিবহন। এজন্য ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। অবশ্য ঢাকায় ৩০ শতাংশ মানুষ পায়ে হেঁটে চলাফেরা করেন বলেও জানান তিনি। একটি পরিকল্পিত নগরীর জন্য মহাপরিকল্পনার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, শহর ছোট হোক কিংবা বড় হোক নগর পরিকল্পনা অবশ্যই থাকতে হবে। ঢাকা এখন গ্লোবাল কানেকটেড সিটি। এই নগরী বিশ্বনগরী হতে যাচ্ছে। তাই নগরীর জন্য যেমন মহাপরিকল্পনা দরকার, তেমনি এই নগরীকে যারা নেতৃত্ব দেবেন অর্থাত্ মেয়র-কাউন্সিলররা—তাদেরও দূরদর্শী এবং দক্ষ হতে হবে। নগর ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ঢাকা নগরীর যারা মেয়র-কাউন্সিলর হবেন, তাদের এই নগরীর ডাইনামিক্স বুঝতে হবে, নগরীর অর্থনৈতিক ভিত্তিটা বুঝতে হবে। সব উন্নয়ন তাদের করতে হবে মহাপরিকল্পনার আওতায়। রাজউকের সিটি করপোরেশনকে সমন্বয় করে নগর গড়ে তুলতে হবে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নজরুল আরও বলেন, স্বাধীনতার পর এক বছরের মধ্যে সংবিধান হয়ে গেছে, দুই বছরের মধ্যে পাঁচসালা পরিকল্পনা হয়ে গেছে। কিন্তু রাজধানীর পরিকল্পনা হয়নি। ১৯৭৪ সালের মধ্যেই রাজধানীর পরিকল্পনা হওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের সময় ১৯৫৮-৫৯ সালে তত্কালীন ডিআইটি যে নগর মহা পরিকল্পনা নেয় সেটাই ভিত্তি। এই মহাপরিকল্পনার মাধ্যমেই ঢাকা নগরী একটি কাঠামো পেয়েছিল। এ পরিকল্পনার আওতায়ই গড়ে উঠেছে মিরপুর রোড, ভিআইপি রোড, তেজগাঁও রোড, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, বনানী, গুলশান, উত্তরা ও শেরেবাংলা নগর। এটা না হলে নগরে বসবাস করা যেত না। এখন সমস্যা বাড়ছে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কাজ না হওয়ার কারণেই। ১৯৯৫ সালে যে পরিকল্পনা নেয়া হয় সেটি ১৯৯৬ সালে অনুমোদিত হয়। ২০১০ সালে ঢাকার ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান নামের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, সেটা ঢাকার স্বার্থেই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঢাকা নগরীর অতীত ইতিহাস উল্লেখ করে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরের রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস। প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে এর আত্মপ্রকাশ ১৬১০ সালে। তখন ঢাকাকে সুবাহ বাংলার প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ঢাকা শহর বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে বিকাশ লাভ করলেও পর্যায়ক্রমে পশ্চিমে তুরাগ নদ ও উত্তরে টঙ্গী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। গত ৪০০ বছর ধরে এই তিনটি নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল এবং এর বাইরেও ঢাকার বিস্তৃতি ঘটেছে। আয়তনে ঢাকার বিকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে স্থানীয় ভৌগোলিক অথবা ভূসংস্থানিক অবস্থা ও পরিবেশ। প্রথমে বন্যামুক্ত এলাকায় গড়ে ওঠে ঢাকা মহানগরী। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভৌত বিস্তৃতির প্রয়োজনে এর আশপাশের নিম্নাঞ্চল ও অন্যান্য এলাকা ভরাট করে নগর উন্নয়ন করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ছিল না। কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা না হলে আগামী দিনে ঢাকার বিস্তৃতি ঘটবে সম্ভবত অবশিষ্ট নিম্নাঞ্চল, জলাভূমি এবং স্থায়ী অথবা মৌসুমি জলাধার ভরাট করে, কৃষিজমি এবং উত্তরাংশের বনাঞ্চল উজাড় করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার একটা বড় অংশ যদি তলিয়ে যায় তবে ঢাকায় এসব স্থানান্তরিত লোকজন এসে বসতি গড়তে পারে। কারণ ঢাকা বাংলাদেশের একেবারেই প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। তিনি বলেন, ২০৫০ সালে ইউএনএফপির মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১৮.৮-২৪.৪ কোটিতে। আর ঢাকার জনসংখ্যা হবে ১.৮৮ কোটি থেকে ২.২ কোটি। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন যোগ করলে ২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা হবে ২.৮২ কোটি থেকে ৩.৩ কোটি। অবশ্য এ সময় ঢাকার বর্তমান আয়তন ১৫৩০ বর্গমাইল থেকে বেড়ে ৩৫০০ বর্গমাইল হতে পারে। তবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বিকেন্দ্রিকরণ করতে পারলে অবস্থা ভিন্ন হতে পারে। অধ্যাপক নজরুল বলেন, ঢাকার প্রথম ৩০০ বছর ছিল প্রাক-শিল্প যুগ। তখন শিল্প ছিল না। ঢাকায় প্রথম আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয় ১৮৭৪ সালে। বিদ্যুত্ আসে ১৮৭৮ সালে। প্রথম রেললাইন স্থাপিত হয় ১৮৮৫ সালে। মোটরযান শুরু হয় গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে। কুটির ও হস্তশিল্পে সমৃদ্ধ ঢাকায় প্রথম শিল্পের মাধ্যমে পণ্য উত্পাদন শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। তবে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা আধুনিক শিল্পশহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ১৯৫০-এর দশকে ঢাকায় শিল্পায়ন গতি লাভ করে এবং ১৯৮০-এর দশকে তা ব্যাপক প্রবৃদ্ধি লাভ করে। তখন আন্তঃনগর বাস যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে টেলিভিশন চালু হয়। ১৯৮০-এর দশকে টেলিফোন সহজলভ্য হয়। তবে বর্তমানে বিশেষ করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগে এক ধরনের বিল্পব ঘটেছে বলা যায়। ইন্টারনেট সুবিধাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবন নির্মাণে ঢাকায় লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। স্থানীয় ডেভেলপাররা সুউচ্চ ভবন এবং ব্রিজ তৈরি করছে। তবে ঢাকায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উত্কর্ষতা আজও অর্জিত হয়নি, বিশেষ করে যোগাযোগ ও পরিবেশ রক্ষায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রের পাকে ঘুরপাক খেয়েছে। গত দুই দশক গণতন্ত্র থাকলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিনিয়োগকে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন করে বিকেন্দ্রিকরণ করা না হলে এখানে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। বাণিজ্য, ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, রফতানি আয়, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও জাতিসংঘের শান্তি মিশনের টাকা ঢাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত উন্নতির মতো নেতিবাচক ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কৌশলগত যাতায়াত পরিকল্পনার (এসটিপি) কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর আওতায় ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সাধারণভাবে উন্নত হবে। সমন্বিত বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় মেট্রোরেল, বাস রেপিড ট্রানজিট গড়ে উঠবে। নগরবাসীকে হাঁটা ও বাইসাইকেল ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। হস্তচালিত কোনো যানবাহন থাকবে না। প্রাইভেট কারকে ব্যাপকভাবে নিরুত্সাহিত করতে হবে। এর বিকল্প হিসেবে ট্যাক্সি সার্ভিসকে গড়ে তোলা হবে। বিদ্যুতের জন্য অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে গ্যাস, কয়লা, সৌরবিদ্যুত্, বায়ু বিদ্যুত্, জৈব জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুত্সহ বিদ্যুত্ আমদানির কথা বিবেচনা করতে হবে। আমাদের কপাল ভালো যে, ঢাকায় আমরা অত্যন্ত ভালো মানের ভূগর্ভস্থ পানি পাচ্ছি। তবে ব্যাপকভাবে উত্তোলনের কারণে এর ভবিষ্যত্ তেমন উজ্জ্বল নয়। আগামীদিনে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি যেমন—মেঘনা, পদ্মা ও যমুনার পানি এবং বৃষ্টির পানি ব্যবহারের কথা ভাবতে হবে। ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার হাল করুণ। উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এ খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে। ঢাকাকে অভিবাসীদের শহর উল্লেখ করে অধ্যাপক নজরুল বলেন, এখানে গড়ে উঠেছে শিক্ষার অবারিত সুযোগ। ঢাকা আজ আর শুধু রাজধানী শহরই নয়, এটি এখন শিল্প, বাণিজ্য, প্রশাসনিক ও শিক্ষার শহর। ঢাকায় ১৯৯২ সালের পর ৫৪টি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এগুলোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ। তাছাড়া ৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তিনি বলেন, হাজার বছরের পুরনো ঢাকা এখন পৃথিবীর বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর একটি। তারপরও কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে ওঠা ঢাকা এখন পৃথিবীর অন্যতম একটি মহানগরী। ঢাকাকে ৩ থেকে ৪টি ভাগে ভাগ করে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। ঢাকার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে বাসিন্দাদের সাহস এবং প্রাণ-উচ্ছ্বাস বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক নজরুল। তিনি বলেন, তারা সংস্কৃতিকে ভালোবাসে। তবে ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এবং একে বাসযোগ্য রাখতে হলে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি নেতাদের চিন্তা ও কর্মে আরও উদ্ভাবনী ক্ষমতার, উদ্যমী, সত্ এবং দক্ষ হতে হবে। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এখানে মানসম্মত নাগরিক সেবা গড়ে ওঠেনি। যোগাযোগ, পরিসেবা, আবাসন, সামাজিক ও বিনোদনমূলক সুযোগ-সুবিধা, প্রশাসনিক, শিল্প, ব্যবসা, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ঢাকাকে বিশ্বমানের নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জাতীয় ও স্থানীয় নেতারা তেমন মাথা ঘামাননি। নেয়া হয়নি কোনো সঠিক পরিকল্পনা। বিভিন্ন সময়ে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তাও যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয়নি। রাজউক প্রণীত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন। নতুন রাস্তা ও পরিসেবা, পার্ক, সবুজায়ন, শিল্প, বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধাসহ বহুবিধ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য এসব জমি প্রয়োজন। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সমস্যাসঙ্কুল হওয়ার কারণে ঢাকাকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানসম্মত জীবনের উপযোগী একটি গতিশীল শহর হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ার কারণে সারাদেশের সঙ্গেই ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। পাকিস্তানের করাচি শহর এক প্রান্তে। তেমনি দিল্লি শহর ভারতের উত্তরে। কিন্তু ঢাকা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ঠিক মাঝখানটায়। ব্যাংকক শহরও মাঝখানে পড়েছে। এটা ঢাকা নগরীর একটি ইতিবাচক দিক। চট্টগ্রাম বন্দর ও মংলা বন্দরও এর অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় আর্থিক ও সেবা খাতের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তাতে একথা স্পষ্ট যে, ঢাকাকে একটি বিশ্ব নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, যেখান থেকে পণ্য ও সেবা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হবে। ঢাকা শহরের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করতে হবে, যার ফলে বিশ্ববাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়। বিশ্বনগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পর্যটন খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হবে এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শিল্প ও বাণিজ্যে শক্তিশালী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঢাকা সম্পর্কে আগ্রহী হবেন। তবে এর জন্য সঠিক পরিকল্পনা দরকার। এটা করা গেলে ঢাকার দেশি-বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতারা বিশ্ব নগরীর সুফল ভোগ করতে পারবেন।




favorite
লেখক সম্মানী