ঈশ্বর কণার সন্ধান লাভ সত্যেন বোস কেন উপেক্ষিত
সৈয়দ আবদাল আহমদ
ঈশ্বর কণার সন্ধান লাভ বিজ্ঞানের জগতে এক আলোড়িত ঘটনা। হিগস-বোসন নামে যে কণাটি এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল, সেটিই আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা। হিগস-বোসন কণাকেই বিজ্ঞানীরা ‘গড পার্টিকল’ বা ঈশ্বর কণা নামে অভিহিত করছেন। এই কণার অস্তিত্ব আবিষ্কারের মুহূর্তটি বিজ্ঞানের জগতে একটি মোড়-ঘোরানো মুহূর্ত। এমন মুহূর্ত বহুদিন আসেনি। ফলে অনেকে ওই মুহূর্তটিকে বিজ্ঞানের ঈশ্বর দর্শনের সঙ্গেও তুলনা করেছেন।
ঈশ্বর কণার সন্ধান লাভের খবরে পৃথিবীর তাবত্ বিজ্ঞানী উল্লসিত। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সার্ন গবেষণাগারের মিলনায়তনে ঢুকতে সেদিন সারারাত অপেক্ষায় ছিলেন হাজারখানেক বিজ্ঞানী। তারা হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব প্রমাণের ঘোষণা সামনে থেকে জেনে-শুনে সাক্ষী হওয়ার জন্য ছিলেন উদগ্রীব। অশীতিপর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগস, যার নামে কণাটির নামকরণ, তিনি এখনও বেঁচে আছেন। আবিষ্কারের খবরে তিনিও ছিলেন ভীষণ আবেগাপ্লুত। উত্ফুল্ল এই বিজ্ঞানী বললেন, ‘এই সাংঘাতিক অর্জনের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের সবাইকে আমার অভিনন্দন জানাই। আমার জীবিতকালেই যে এটা ঘটল, সেটা আমার কাছে একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার।’ কণাটির নামকরণের সঙ্গে জড়িত আরেক বিজ্ঞানী, বাঙালিদের গর্ব সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে তিনিও হয়তো একই আবেগ প্রকাশ করতেন। বর্তমান বিশ্বের আলোচিত বিজ্ঞানী ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কারের জন্য, যার নামে এই কণার নামকরণ হয়েছে, সেই পিটার হিগসকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গর্ডন কেইনের সঙ্গে এক বাজিতে আমি বলেছিলাম, এ ধরনের কণার অস্তিত্ব নেই। এখন মনে হচ্ছে আমি হেরে গেছি, ১০০ ডলার বাজিতে খোয়াতে হবে। রসায়নের ছাত্র হিসেবে এই আবিষ্কারের খবর আমাকেও কৌতূহলী করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে পদার্থ বিজ্ঞান আমার সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট ছিল। সেই সুবাদে ‘পার্টিকল ফিজিক্স’ কিছুটা পড়েছি। ল্যাবরেটরির প্রাকটিক্যাল ক্লাসেও ‘পার্টিকল ফিজিক্স’-এর বিভিন্ন বিষয় নাড়াচাড়া করেছি। ওই সময়ই স্যারদের কাছে হিগস-বোসন কণা তত্ত্বের ব্যাখ্যা শুনেছি। ফলে তত্ত্বের সেই বিষয়টি যখন বাস্তবে রূপ পেয়েছে, তখন বিষয়টি আমাকেও দারুণ উত্তেজিত করেছে। ‘ঈশ্বর কণা’ হিসেবে পরিচিত হিগস-বোসনের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য গবেষণা চলছে প্রায় ৪৫ বছর ধরে। অবশেষে ৪ জুলাই কণাটি আবিষ্কারের ঘোষণা এলো। ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের (সার্ন) কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে বিজ্ঞানীরা নতুন কণার অস্তিত্ব ঘোষণা করলেন। বললেন, নতুন একটি অতিপারমাণবিক কণার অস্তিত্ব সত্যিই পাওয়া গেছে; আর তা হিগস-বোসন কণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হিগস-বোসন কণাটি আসলে কী, এই কণা আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানের কী লাভ হলো এবং এই কণা নিয়ে কেন এত মাতামাতি—এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইব্রাহিমের কাছে। তিনি বলেন, এই কণা আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানের তাত্ক্ষণিক কী লাভ, তা এখনও বলার সময় আসেনি। তবে অনেক তত্ত্বের, অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা করা যাবে। হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব মিলেছে বলে পদার্থবিদ্যার একটি মৌলিক প্রশ্নের সমাধান পাওয়া যাবে। বিষয়টি খুবই জটিল। তার মতে, মহাবিশ্বের উত্পত্তির শুরুতে সবকিছুই ছিল শক্তি হিসেবে। কোনো কিছুর ভর ছিল না। কণিকাগুলোই এক সময় ভর লাভ করে। এটিই হিগসের তত্ত্বের মূল কথা। এই ভরযুক্ত কণিকা যদি না হতো, তাহলে কোনো গ্যালাক্সি, তারা, পৃথিবীর মতো গ্রহ দানা বাঁধত না। ফলে আমাদের বস্তুজগতও আসত না। আমরাও আসতাম না। সুইজারল্যান্ডের সার্ন গবেষণাগারে হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে। সার্ন মাটির নিচে অবস্থিত বিশাল একটি গবেষণাগার। জেনেভার কাছে এই গবেষণাগারটি ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এখানে সুবিশাল যন্ত্র লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের (এলএইচসি) মাধ্যমে প্রোটন কণার মধ্যে অতি উচ্চগতিতে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এই গবেষণাগারে আছে পৃথিবীর চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র সিএমএস, আছে সংঘর্ষ ঘটানোর পর শক্তিশালী কণিকা শনাক্তকরণ যন্ত্র, সুড়ঙ্গের ভেতরে আলোর বেগের কাছাকাছি প্রোটনের স্রোতের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এর ফলেই নতুন অতি পারমাণবিক কণাটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কণাটি আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা জানান, হিগস-বোসন কণা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি রহস্যসহ অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে পারে। এই আবিষ্কারকে তাই মানবসভ্যতার জন্য মাইলফলক হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। সার্নের বিবৃতিতে বলা হয়, আবিষ্কৃত নতুন এই অতি পারমাণবিক কণা হিগস-বোসন কণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে এটি আসলেই হিগস-বোসন কিনা, তা নিয়ে নিশ্চিত বলতে আরও তথ্য-উপাত্ত দরকার। সার্নের মহাপরিচালক রল্ফ হওয়ের বলেন, হিগস-বোসনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি কণার আবিষ্কার আরও বিশদ গবেষণার দ্বার খুলে দিয়েছে। এ আবিষ্কারের পর ব্রিটিশ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফ্যাসিলিটিজ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী অধ্যাপক জন উমার্সলি বলেন, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমরা আজ এমন কিছু জানি, যা গতকালও জানা ছিল না। সার্নে লার্জ হেড্রন কোলাইডারের একটি বৈজ্ঞানিক দলের প্রধান জো ইনক্যান্ডেলা বিবিসিকে বুঝিয়ে বলছিলেন—এই কণার সন্ধান পাওয়ার গুরুত্বটা কোথায়? তিনি বলেন, ‘আমি একটা সহজ তুলনা টেনে বোঝাতে চাই এটা খুঁজে পাওয়াটা কেন সাংঘাতিক ব্যাপার। যে প্রোটন বিমের কলিশন বা সংঘাত থেকে আমরা এটা পেয়েছি, তার প্রতিটা কলিশনকে যদি একটা বালুকণা ধরি—তাহলে অলিম্পিক সাঁতার প্রতিযোগিতা করা যাবে এই মাপের একটা পেল্লায় সুইমিং পুল ওই বালুকণা দিয়ে ভরে ফেলা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, গবেষণার শেষে যে সিগন্যালগুলো আমরা দেখেছি, সেগুলো মাত্র কয়েক ডজন—আপনার আঙুলের ডগায় যতগুলো বালুকণা উঠবে বড়জোর ততগুলো—ফলে বুঝতেই পারছেন কী অসম্ভব বিরল এই জিনিসটি। বিজ্ঞানীরা যে হিগস-বোসনের খোঁজ পেলেন, তাতে লাভটা ঠিক কী হলো? এ প্রসঙ্গে ওই বিজ্ঞানী বলেন, এর সোজা উত্তর হলো, পার্টিকল ফিজিক্সের বহু বহু বছরের একটা প্রচলিত ব্যাখ্যা, যার ভেতরটা দাঁড়িয়ে আছে এই কণার অস্তিত্বের ওপর, সেটা এখন সত্যি বলে প্রমাণিত হলো। এই কণা না পাওয়া গেলে বিজ্ঞানের সেই তত্ত্বকে সোজাভাবে ব্যাখ্যা করা যেত না। পঞ্চাশ বছর ভুলের পেছনে ছোটেননি বিজ্ঞানীরা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে যখন এই কণাটির অস্তিত্বের কথা প্রথম অবতারণা করা হয়, তখন বিজ্ঞানী পিটার হিগস ছাড়াও বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুসহ আরও অনেকেই জড়িত ছিলেন সেই সব তত্ত্বীয় গবেষণায়—এদেরই একজন প্রফেসর টম কিবল বিবিসির কাছে বলেন, ‘পার্টিকল ফিজিক্স বা কণা-পদার্থবিদ্যার যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল, সেটাকে খাপে খাপে বসানোর জন্য এই কণাটা হলো শেষ হারানো টুকরো। বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে আমরা যেসব ফলাফল পেয়েছি, সেগুলো এই মডেল দারুণ সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু এই মডেলটা খাড়া করার জন্য কণাটাকে পাওয়া দরকার ছিল।’ মি. কিবলের কথায়, ‘হিগস কণার প্রধান কাজটা হলো—সোজা কথায় বললে, অন্য আরও বহু কণাকে তাদের ভর দেয়া। কিন্তু হিগস যদি না থাকে, বা এই কাজটা না করে… তাহলে অন্য কেউ তো সেটা করছে, আমাদের অন্যভাবে সেই ব্যাখ্যাটা খুঁজে পেতে হতো।’ ফলে বিজ্ঞানীরা আপাতত নিশ্চিন্ত, হিগস-বোসনের সন্ধান তাদের এতদিনকার ধারণাকেই সঠিক প্রতিপন্ন করেছে। পঞ্চাশ বছর ধরে তারা যে একটা ভুলের পেছনে ছোটেননি, সেটাকে নিশ্চয়তা দিয়েছে। সার্নের আরও একজন বিজ্ঞানী ড. টম হুইনটির কথায়, ‘হিগস-বোসন ছাড়া, বা এর কাজের পদ্ধতিটা ছাড়া—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে থাকত শুধু আলো। কারোরই কোনো ভর থাকত না, কোনো আদান-প্রদান থাকত না। সত্যি বলতে কী, সেটা বোধহয় খুব বিরক্তিকর একটা ব্যাপারই হতো!’ ড. হুইনটি একই সঙ্গে বলছেন, ‘কিন্তু এখন বোধহয় আমরা জানি কীভাবে কণাতে ভর এলো, আর আমরা যেভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করি, সেই বোঝাটাতেও যে কোনো ভুল নেই সেটাও নিশ্চিত হলো। ফলে এটা মানুষের দুর্নিবার কৌতূহলের জয়, যে হাজার হাজার বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ সেই কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য কাজ করে গেছেন তাদের জয়!’ ফলে হিগস-বোসনের সন্ধান মানুষের ব্যবহারিক জীবনে কী পরিবর্তন আনবে, বা আদৌ আনবে কি-না, সেটা বলা খুব শক্ত। কিন্তু বিজ্ঞানকে চালিত করে যে বিশুদ্ধ জ্ঞানপিপাসা—বহু বহু বছর পর সেই তৃষ্ণা যে অবশেষে মিটল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই! সত্যেন্দ্রনাথ বসুরও মূল্যায়ন চাই ঈশ্বর কণার আবিষ্কারে উত্ফুল্ল বিজ্ঞানীরা স্মরণ করতেই ভুলে গেছেন হিগস-বোসন কণা যাদের নামে, তাদের একজন বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। ১৯৬০ সালে হিগস-বোসন কণার ধারণার প্রবর্তক পিটার হিগসকে নিয়েই প্রশংসা করা হচ্ছে। উপেক্ষা করা হচ্ছে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদানকে। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু বা সত্যেন বোসের এ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই কণার নামকরণ হয়েছিল ‘বোসন’ কণার। তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ারও দাবিদার ছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অর্জনের ঘোষণা সত্ত্বেও সত্যেন বোসের নাম আলোচনায় নেই। ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি উত্তর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ১৯১৩ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক হন এবং ১৯১৫ সালে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপরই তিনি কলকাতায় শিক্ষকতা পেশায় ব্রতী হন। বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে গবেষণাও শুরু করেন তিনি। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালে তিনি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি তার গবেষণাপত্র ছাপতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উপেক্ষিত হন। তিনি সরাসরি যোগাযোগ করেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে। এরপর তাকে চিনতে শুরু করে সবাই। ১৯২৭ সালে তিনি আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেছেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের স্মৃতি রক্ষার্থে ‘বোস চেয়ার’ নামে চেয়ার প্রতিষ্ঠিত আছে। বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর সঙ্গে ঢাকার আরেকটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে। রাজধানী ঢাকার যে জায়গাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাব, সেখানে থাকতেন বিজ্ঞানী সত্যেন বোস। এখানে একটি লাল বাড়ি ছিল। এই লাল বাড়িতেই থাকতেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ওই লাল বাড়িটাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় প্রেস ক্লাব। আশির দশকের শেষের দিকে লাল বাড়িটা ভেঙে প্রেস ক্লাবের বর্তমান ভবন নির্মাণ করা হয়। আজ যখন হিগস-বোসন কনার অস্তিত্ব আবিষ্কারে সারা পৃথিবী মাতামাতি করছে, তখন সত্যেন বসুর নামটি স্মরণ করতে গিয়ে খুব ভালো লাগছে। কারণ প্রেস ক্লাবের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আমি। তবে ঈশ্বর কণার সাড়া জাগানো ওই আবিষ্কারের সঙ্গে বিজ্ঞানী হিগসের মতো সত্যেন বোসের নামটিও আলোচিত না হওয়ায় দুঃখ পাচ্ছি। বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল গাণিতিক পদার্থ বিদ্যা। তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে ১৯২০ সালে ‘বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান তত্ত্ব’ বা থিওরি প্রদান করেন, যা পদার্থ বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত। নোবেল পুরস্কার কেবল জীবিতরাই পেয়ে থাকেন। সেই ক্ষেত্রে হয়তো সত্যেন বসু সেটা পাবেন না। তবে এই অসাধারণ বাঙালি বিজ্ঞানীকেও স্মরণে রাখার জন্য বড় কোনো সম্মানে সম্মানিত করা উচিত। বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, বিশ্ব সৃষ্টির সময় স্রষ্টার হাতে আর কোনো বিশ্বের তুলনা ছিল কিনা, এ নিয়ে তার যথেষ্ট কৌতূহল জাগে। অর্থাত্ এই বিশ্ব একটিই কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন দাঁড়ায়। বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিরামহীন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মহাবিশ্ব কি একটিই, নাকি অনেক বিশ্বের মধ্যে আমাদের এই পৃথিবীটা ক্ষুদ্র একটি বিশ্ব? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চলছে নানা গবেষণা। ষোলো শতকের জ্যোতির্বিদ জোহান কেপলার থেকে শুরু করে এই যুগের স্টিফেন হকিং পর্যন্ত মহাবিশ্বের রহস্য উদ্ধারে বিভিন্ন থিওরি নিয়ে কাজ করছেন। তবে কসমোলজি বা বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল বলছে, এই মহাবিশ্বে অসংখ্য বিশ্বের সঙ্গী আমাদের এই বিশ্ব। অসংখ্য বিশ্ব নিয়ে তৈরি এই অনন্ত বিশ্ব বা মাল্টিভার্স। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আরও আবিষ্কার একদিন হয়তো সব প্রশ্নেরই জবাব খোলাসা করবে। যেমন ৪৫ বছরের নিরলস গবেষণার পর হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব প্রমাণ হয়েছে।