‘আমার একটা বই বের হলে রেণু খুশি হবে’
সৈয়দ আবদাল আহমদ
মাত্র কিছুদিন আগেই আমার শারীরিক অবস্থা নিয়ে সামাদ ভাই ছিলেন উদ্বিগ্ন। হার্টের ছয়টি ব্লকের চিকিত্সার জন্য ব্যাংকক অবস্থানকালে চিকিত্সা পরিস্থিতি জানার জন্য দু’বার তিনি সেখানে ফোন করেছেন। শওকত ভাই (সাংবাদিক শওকত মাহমুদ) সঙ্গে থেকে আমার চিকিত্সা তদারকি করছেন জেনে খুব আশান্বিত হয়েছেন। বলেছেন—‘তোমার সঙ্গে শওকত আছে, আমি নিশ্চিন্ত।’
তবুও প্রায় প্রতিদিন আমার স্বজনদের কাছে, আমার দেশ কার্যালয়ে সহকর্মীদের কাছে ফোন করে আমার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন। আমি ভালো হয়ে ফিরে এসেছি, কাজে যোগ দিয়েছি। গত শুক্রবার এ কলামে আমার লেখা বের হওয়ার আগের দিন সামাদ ভাইকে ফোন করি। আমার সঙ্গে কথা বলে খুব খুশি হয়েছেন। বলেছেন, এখন বেশি চাপ নিও না। শুক্রবারের জন্য লিখেছি জেনে খুশি হয়ে বলেছেন, দোয়া করি—দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসো। তার কুশল জিজ্ঞাসা করতেই বললেন—শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ঠাণ্ডা লেগে বুকে ইনফেকশনের মতো কিছু একটা হয়েছে। আমি তাকে আর কথা না বলতে অনুরোধ করলাম। বললাম, বাসায় এসে আমি দেখে যাব। তিনি নিষেধ করে বললেন, শরীরটা ঠিক হলে আরও কিছুদিন পর এসো। সেই মানুষটির সঙ্গে আর দেখা হলো না, এ দুঃখ সইতে পারছি না। কান্না পাচ্ছে। দু’দিন এ্যাপোলো হাসপাতালে ছুটে গিয়েছি। দুর্ভাগ্য, জীবিতাবস্থায় তাকে আর দেখতে পাইনি। শুনেছি অপারেশন কক্ষে যাওয়ার আগে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তার ভাইপো মুক্তিযোদ্ধা উলফাত ভাই বললেন, আপনাদের দেখতে পেলে তিনি খুব খুশি হতেন। কিছুক্ষণ আগে শুনেছেন আপনারা আসছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ঢাকার নির্মম যানজট সেই সুযোগটি থেকে আমাদের বঞ্চিত করল। চিরদিনের জন্য এই আক্ষেপটি থেকে গেল আমাদের। তার জন্য এখন কী করতে পারি, কিছুই বুঝতে পারছি না। মহান আল্লাহ্র কাছে এ দোয়াই করি. তিনি যেন জান্নাতবাসী হোন।
সাংবাদিকতার এক মহীরুহ
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক মহীরুহ আতাউস সামাদ। এদেশের সাংবাদিকতাকে যে ক’জন দিকপাল সাংবাদিক এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, তাদের অন্যতম তিনি। সেই পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের এ পর্যন্ত যত তোলপাড় করা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার তিনি জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন। এসব ঘটনার তিনি রিপোর্টিংই শুধু করেননি, ঘটনার বিশ্লেষণ করেছেন এবং এ নিয়ে দু’হাত ভরে লিখেছেন। ষাটের দশকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শুনানি একজন রিপোর্টার হিসেবে আতাউস সামাদ শুধু কভারই করেননি, এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বার্তা জেল থেকে নিয়ে গিয়ে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর কাছে পৌঁছিয়েও দেন। সেই বার্তার পরিপ্রেক্ষিতেই মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবকে মুক্ত করতে লাট ভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেন এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে কলকাতা থেকে তার সঙ্গে প্লেনে করে তিনি ওই ঐতিহাসিক ঘটনাটির সরেজমিন রিপোর্ট করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর রক্তচক্ষু এড়িয়ে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের রিপোর্ট বিবিসির মাধ্যমে প্রচার করে আতাউস সামাদ এদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যান। এজন্য তাকে চরম মূল্যও দিতে হয়েছে। অকুতোভয় এই সাংবাদিককে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার ১৯৮৭ সালে গ্রেফতার করে জেলে পোরে। দেশ-বিদেশে এ গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে পনের দিন পর আতাউস সামাদকে ছেড়ে দিতে এরশাদ বাধ্য হন। ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর, পতনের ঠিক আগমুহূর্তে জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের ১৫ দিন সময় চেয়ে একটি ফর্মুলা ঘোষণা করেছিলেন। এ সময় দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা আত্মগোপনে ছিলেন। এ আত্মগোপন অবস্থা থেকেই বিবিসির জন্য খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্কার নেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন আতাউস সামাদ। খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলাপ করে তার ফোন নম্বরটা বিবিসিকে আতাউস সামাদ সরবরাহ করলে ওই ঐতিহাসিক সাক্ষাত্কারটি প্রচারিত হয়। বেগম জিয়া বলেছিলেন—‘এরশাদকে এক্ষুনি, এই মুহূর্তে পদত্যাগ করতে হবে।’ এর পরই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। এরশাদের জারি করা কারফিউ ভেঙে খান খান হয়ে যায়। এরশাদের জাতীয় পার্টির সেই আল্লাহওয়ালা বিল্ডিং মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকারের সময় খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে তার মুক্তি চেয়ে সাতশ’ সাংবাদিকের বিবৃতিতে প্রথম স্বাক্ষরটি করেন আতাউস সামাদ।
সাধারণ মানুষের প্রতি আতাউস সামাদের দরদের কোনো তুলনা নেই। তাদের কল্যাণ হয় এমন রিপোর্ট তিনি যেমন সারাজীবন করে গেছেন, তেমনি আমরা যারা তার অনুজ, তাদেরও করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। কৃষিতে বিপর্যয় হয়েছে কিনা, এ বিপর্যয় কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, কৃষকের অবস্থা, কৃষক কেমন করে বাঁচবে, বাজারে জিনিসপত্রের দাম কেন বাড়ল, বাড়ি ভাড়া, সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে, শ্রমজীবী মানুষের চলার উপায় কী, কোন রাস্তাটা ভাঙা, বিদ্যুত্-গ্যাস-পানির সঙ্কটে এবং যানজটে মানুষ কীভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে—এসব বিষয়ই তার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে সব সময়। বিশেষ করে ধান, চাল ও পাটের অবস্থা, বন্যা আসছে কিনা, বন্যার ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়—এ নিয়ে একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি সব সময় খবর রাখতেন। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে কয়েক বছর আগে তিনি রাজশাহী গিয়েছিলেন। সেখানে পদ্মার জীর্ণদশা দেখে তিনি শুধু মর্মাহতই হননি, সফরসঙ্গী ফটো সাংবাদিককে দিয়ে শুকনো পদ্মার ধু-ধু বালুচরের অসংখ্য ছবি তুলিয়ে এনেছিলেন। ঢাকায় আমার দেশ অফিসে এসেই তিনি আমাকে ডেকে বললেন—পুরো একটি পাতাজুড়ে ছবি দিয়ে পদ্মার এই মরে যাওয়ার কাহিনী ছাপতে হবে। পাতাটির নামও তিনি দিয়েছিলেন—‘চারিদিকে দেখ চাহি’। এ পাতাটি এখনও আমার দেশ-এ বের হচ্ছে এ ধরনের কাহিনী নিয়ে।
১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যার সময় তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি। একজন জুনিয়র রিপোর্টারের মতোই বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে সরেজমিন রিপোর্ট করেছেন। একেক দিন একেক কাগজে তার রিপোর্ট বের হয়েছে। দৈনিক দিনকালে মুন্সীগঞ্জে বন্যার চিত্র বিশেষ করে আলু চাষীদের দুর্দশার বিবরণ তিনি এত সুন্দর এবং প্রাঞ্জল ভাষায় লেখেন যে, আমি আজও সেই রিপোর্টটির কথা ভুলতে পারিনি। একটি রিপোর্টকে পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহী এবং একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য রিপোর্টটির যথার্থতা যাচাই করার জন্য যতগুলো সূত্র আছে সব জায়গায় তিনি সত্যতা যাচাই করতেন। রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে যাচাই করার বিষয়টাকে প্রাধান্য দিতে আমাদের প্রতি সব সময় তার তাগিদ ছিল। তাছাড়া রিপোর্টে তথ্যের গরমিল একেবারেই তিনি পছন্দ করতেন না। তেমনি রিপোর্টে একই কথার পুনরুক্তি করলেও তিনি রাগ করতেন। সকাল থেকে রাতে ঘুমানোর আগপর্যন্ত সর্বক্ষণই তার মাথায় থাকত সাংবাদিকতা। রিপোর্টের কোনো আইডিয়া মাথায় এলেই ফোন করে সাবজেক্টটি আমাকে দিয়ে দিতেন এবং রিপোর্টটি না করা পর্যন্ত পেছনে লেগে থাকতেন। বাসায় বসে ইন্টারনেট সার্চ করে আন্তর্জাতিক কোনো ইন্টারেস্টিং বিষয় চোখে পড়লেও তিনি অফিসের বার্তা সম্পাদক কিংবা সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে জানাতেন।
পঁচাত্তর বছর বয়সে এসেও লেখালেখির বিষয়ে তাকে ক্লান্ত হতে দেখিনি। শরীরের নানা ধরনের অসুস্থতা নিয়েও সপ্তাহে তিনি অন্তত চারটি উপ-সম্পাদকীয় লিখতেন। এ লেখাগুলো আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হতো। বাংলায় চারটি উপ-সম্পাদকীয় ছাড়াও হলিডেতে নিয়মিত ইংরেজিতে একটি কমেন্ট্রি লিখতেন। সেই ১৯৫৭ সাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত তিনি। এ যাবত তিনি লিখেই গেছেন। বাংলাদেশ অবজারভার, বাংলাদেশ টাইমস, বাসস, বিবিসি, দৈনিক আমার দেশ, এনটিভি, হলিডে—এমন মিডিয়ায় তিনি কাজ করেছেন। বিবিসি’র সংবাদদাতা হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বাধিক আলোচিত সাংবাদিক। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে তিনি শিক্ষকতাও করেছেন। তার বেশিরভাগ লেখালেখিই ইংরেজিতে। তবে ১৯৯১ সালের পর সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকা ফের প্রকাশিত হলে সেখানে তিনি বাংলায় লেখা শুরু করেন। এরপর বাংলায় তার অসংখ্য লেখা বের হয়েছে। যায়যায়দিনে তার বিখ্যাত ‘একালের বয়ান’ কলামটি ছিল খুবই জনপ্রিয়। এমন একজন গুণী সাংবাদিককে হারিয়ে সাংবাদিকতার জগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা হয়তো আর কোনোদিন পূরণ হবে না। আমার সৌভাগ্য এমন একজন মানুষ, এমন একজন সম্পাদক এবং সাংবাদিকের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। এটা আমার সারাজীবনের গর্ব।
তার দরদি মন
সাধারণ মানুষের প্রতি অসম্ভব দরদি ছিলেন আতাউস সামাদ। তাদের কতটা তিনি ভালোবাসতেন, তার লেখার নিচের অংশটি এর প্রমাণ। নদীভাঙা মানুষকে নিয়ে একটি লেখা থেকে তা তুলে ধরছি : ‘আহা রে আমার দেশের নদীর মানুষ! তার সব ধুয়ে মুছে গেলেও মনের রস যায় না। এমনকি পায়ের তলার মাটি যখন হারিয়ে যায় তারপরও না। নদীর ভাঙনে আমাদের দেশের যে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর ঘর-বাড়ি-জমি খোয়াচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে একটা ঠিকানা পর্যন্ত যাদের থাকে না. তাদেরকে আজকাল বাংলাদেশের গ্রামে বলে ‘নদী-ভাঙা মানুষ’। নদী-ভাঙা এক মানুষ যিনি এক বৈশাখী সন্ধ্যায় মেঘনার বুকে নৌকায় আমাদের সহযাত্রী হয়েছিলেন, তিনি তার অফুরন্ত রসবোধের পরিচয় দিয়ে গান ধরেছিলেন : পদ্মা নদীর নাইয়া কোথায় যাও বাইয়া নাওয়ের বাদাম তুইল্যা, আমারে যাও লইয়া। গানের কথাগুলো গ্রামের সেই চিরন্তন বধূর কথা মনে করিয়ে দেয়, যে কাঁধ থেকে সংসার-জোয়াল নামিয়ে রেখে অল্প ক’দিনের জন্য হলেও ভাইয়ের বাড়িতে বিশ্রাম নিতে যেতে চায় এবং তাতে বারবার নিরাশ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত নিরুদ্দেশেই হারিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মেঘনার ‘নদী-ভাঙা’ আমাদের এই গায়েন যখন গান সমাপন করছিলেন, তখন তার উদাত্ত গলা বুজে এসেছিল। আনমনা হয়ে গুনগুন করছিলেন তিনি। আমরা নিবিষ্ট হয়ে সেই সুরের রেশেই মগ্ন ছিলাম। আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম যে, এখন গাঁয়ের বধূ নয়, মেঘনাপাড়ের এক নদী-ভাঙা মানুষ চলে যেতে যাচ্ছেন এখান থেকে অন্য কোথাও, কোনো অজানায়, একটা ঠিকানা আর একটু বিশ্রাম ও শান্তির আশায়। তার বর্ণনা দেয়া যায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘সিন্ধু’ কবিতার দুটি চরণ দিয়ে : শ্রান্ত মাঝি গাহে গান ভাটিয়ালী সুরে, ভেসে যেতে চায় প্রাণ দূরে—আরো দূরে। সেদিন বিকালেই খানিক আগে ‘নদী-ভাঙা’ আরেকজনকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘এভাবে আর কতদিন? আর ক’বার ভাসবেন? আবার ভাসলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন?’ তার উত্তর ছিল, ‘জানি না, সত্যি জানি না।’ ‘আর কোনো যাওয়ার জায়গা নাই আমাদের। আবার ভাসলে ওই সড়কে উঠব, বন্যার সময় মেয়ে ছাওয়ালগো রাইখ্যা আইছিলাম ওই খানে। এবার সবাই উঠবো ওই সড়কে। এরপর হে যেইখানে লইয়া যায় যাবো।’
আমার দেশ ও আতাউস সামাদ
২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দৈনিক আমার দেশ বের হওয়ার কয়েক মাস আগেই আমরা এ পত্রিকায় যোগদান করি। পত্রিকাটির কর্ণধার মোসাদ্দেক আলী একে একটি গ্রহণযোগ্য এবং জনপ্রিয় পত্রিকা করার অভিপ্রায় প্রকাশ করলেন। পত্রিকাটির সম্পাদক সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর, নির্বাহী সম্পাদক রাশীদ-উন-নবী বাবু। আমাদের সঙ্গে বিশিষ্ট কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনও যোগ দিয়েছেন। আমরা সবাই পত্রিকা নিয়ে মতবিনিময় করে অনুভব করলাম, এ পত্রিকায় যদি খ্যাতিমান সাংবাদিক আতাউস সামাদকে যুক্ত করা যায়, তাহলে সহজেই পত্রিকাটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে। আমাদের সঙ্গে মালিকপক্ষও একমত। তারাও অনুরোধ করলেন, যেভাবেই পারা যায় সামাদ ভাইকে এখানে নিয়ে আসা। একই সময়ে সামাদ ভাইকে যুগান্তরে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি। এ গুরুদায়িত্বের কিছুটা আমার ওপরও পড়ে। কারণ সামাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার ভালো জানাশোনা আছে এবং তিনি আমাকে স্নেহও করেন। তবে তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, সামাদ ভাইয়ের প্রিয় ছাত্র জাতীয় প্রেস ক্লাবের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি শওকত মাহমুদের কোনো অনুরোধ তিনি ফিরিয়ে দেন না, এ কথাটি আমি জানতাম। তাই শওকত ভাইকে আমরা অনুরোধ করলাম, তিনি যেন একটি ভালো পত্রিকা গড়ে ওঠার স্বার্থে আমার দেশ-এ সামাদ ভাইকে যোগদানে সম্মত করাতে সহযোগিতা করেন। শওকত ভাই তার সঙ্গে কথা বললেন। এরপর একদিন আমি ও রাশীদ-উন-নবী বাবু ভাই তার বাসায় গেলাম। তিনি তখন ধানমন্ডির একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। সামাদ ভাইয়ের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা হলো এবং পরে তিনি এনটিভির চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে।
তিনি আসার পর আমরা সবাই উজ্জীবিত। প্রতিটি জেলায় পত্রিকার জন্য নানা অনুষ্ঠান করা হলো। ২৩ সেপ্টেম্বর পত্রিকাটি বের হলো নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে। এরপর কিছুদিনের মধ্যেই সর্বমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকল আমার দেশ। দেড়-দুই বছরের মধ্যেই আমার দেশ-এর সার্কুলেশন গিয়ে দাঁড়াল ১ লাখ ৯৭ হাজারে। তখন প্রথম আলোর সার্কুলেশন আড়াই লাখের মতো। ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকারের সময় দৈনিক আমার দেশ প্রথম সঙ্কটে পড়ে মালিকপক্ষকে জেলে নেয়ার কারণে। কিন্তু আতাউস সামাদ আমরা সংবাদকর্মীদের নিয়ে পত্রিকাটি বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এসময় বিএসইসি ভবনে আগুন লাগলে পত্রিকাটির অফিস, যাবতীয় কম্পিউটার, সার্ভার এবং সিটিপি মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায়ও পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখা হয় মুরুব্বি হিসেবে তার দিকনির্দেশনায়। এসময় এনটিভির সম্প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আতাউস সামাদ আমার দেশ-এ থাকার পাশাপাশি এনটিভির সিইও’র দায়িত্ব নিয়ে সেটিকেও আবার পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচারে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আমার দেশ চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়ে গেলে আবার শক্তভাবে এর হাল ধরেন আতাউস সামাদ। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে তিনি পত্রিকাটি সবাইকে নিয়ে পরিচালনা করেন। মালিকপক্ষ পত্রিকাটি বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন শিল্প-উদ্যোক্তা পত্রিকাটি কেনার তত্পরতা চালান। এ অবস্থায় আমার দেশ কার্যালয়ে তিনি আমন্ত্রণ জানান বিশিষ্ট উদ্যোক্তা মাহমুদুর রহমানকে। ইতোমধ্যে অবৈধ জরুরি সরকারের বিরুদ্ধে আগুনঝরা লেখার জন্য তিনি খুব আলোচিত। তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল একটি সেমিনার নিয়ে আলোচনার জন্য। কিন্তু সামাদ ভাই আমাদের বলে রেখেছিলেন, আমরা যেন তাকে ধরি পত্রিকাটির দায়িত্ব নেয়ার জন্য। যা-ই হোক, মাহমুদুর রহমান সাহেব আসার পর অন্য আলাপ শেষে আমরা তাকে পত্রিকাটির সার্বিক অবস্থা জানিয়ে এর দায়িত্ব তাকে নেয়ার অনুরোধ করি। সামাদ ভাই আমাদের প্রস্তাব বিবেচনার জন্য তাকে অনুরোধ জানান। ওইদিন তিনি ভেবে দেখবেন বলে জানান। কিন্তু সামাদ ভাই আমাদের নিয়ে কয়েকবার তার কাছে গেলে তিনি সম্মত হন। এভাবেই পত্রিকাটির মালিকানা পরিবর্তিত হয়। নতুন মালিকানায় নতুন উদ্যমে প্রকাশ হতে থাকে আমার দেশ। সার্কুলেশন আবার বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে সরকারের রোষানলে পড়ে আমার দেশ। সরকারের নির্দেশে আমার দেশ বন্ধ ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে জেলে নেয়া হলে আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সামাদ ভাই। একদিকে পত্রিকার প্রকাশনার ব্যাপারে তার চেষ্টা; অন্যদিকে মাহমুদুর রহমানের মুক্তির আন্দোলনে তার নিরলস প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতে পত্রিকাও প্রকাশিত হয় এবং সম্পাদকও মুক্তি পান। সহকর্মী অলিউল্লাহ নোমানকে সত্য লেখার দায়ে সর্বোচ্চ আদালত শাস্তি দিলে আতাউস সামাদ ও ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে প্রেস ক্লাব থেকে মিছিল নিয়ে আমরা তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছে দিই। এ মিছিলের ব্যানারে লেখা ছিল—‘সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের জেলযাত্রা’। সাংবাদিক হত্যা ও সাংবাদিক নির্যাতন এবং সংবাদপত্র দলনের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। যেমন তার বক্তব্যে, তেমনি কলমে।
আমার দেশ নিয়ে আলোড়ন তুলতে সামাদ ভাইয়ের চিন্তায় ‘মা দিবস’ পালনের জন্য গুলশান মাঠে একটি কনসার্ট হয়েছিল। এই কনসার্টে দেশবরেণ্য সব শিল্পী মাকে নিয়ে গান গেয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে আমার ছেলে-মেয়েও মাকে নিয়ে গান শুনিয়েছিল। সেই থেকে আমার মেয়ে শামা ও ছেলে দীপ্যকে পেলেই তিনি বলতেন—‘গান ছেড়ো না, আইনস্টাইনও বেহালা বাজাতেন।’ মা দিবসে আমার দেশ অফিসে একটি গোলটেবিলে মাকে নিয়ে বিশিষ্টজনদের স্মৃতিচারণ শুনে শিশুর মতো তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন। পঁচাত্তরতম জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে ক্লাব চত্বরে আমরা তাকে সম্মাননা জানিয়েছিলাম। ভাবী, ছেলে সন্তু ও নাতি এবং মেয়ে শান্তাকে নিয়ে তিনি ক্লাবে এসেছিলেন। এত খুশি হয়েছিলেন যে, আজ স্মরণ করে আমার ভালো লাগছে। জন্মদিন উপলক্ষে আমার দেশ-এর সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছিলেন—‘আমি আরও লিখতে চাই। অনেক কিছু লিখেছি; কিন্তু দেশ ও সমাজের উপকার হয়—এমন কিছু এখনও লিখতে পারিনি। বয়স হয়েছে, জানি না লেখার সময় পাব কিনা।’ দেশ ও সমাজ নিয়ে এত কিছু তিনি লিখেছেন, তারপরও তার তৃপ্তি মেটেনি।
আতাউস সামাদের একালের বয়ান
এত বেশি লেখালেখির পরও বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। কেন তিনি বই প্রকাশ করছেন না বললেই তিনি বলতেন, ও কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার বই ‘একালের বয়ানে’ তিনি এ নিয়ে লিখেছেন—আমার বউ রেণু, মনে করে যে, আমার অবশ্যই বই লেখা উচিত। ওর এমন কথা ভাবার কারণ হচ্ছে, ও আটাশ বছর ধরে দেখে আসছে যে, আমি প্রায় প্রতিদিন টাইপ-রাইটার নিয়ে খটখট করছি। বিয়ের পর প্রথম দিকে প্রায়ই কথা দিয়েও মাঝরাতের আগে অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে পারতাম না কাজের চাপে। তখনও সে অফিসে ফোন করলে ওই টাইপ-রাইটারের আওয়াজই শুনতে পেত। আমরা রিপোর্টাররা টাইপ করছি। এখন বাড়িতে বসেই অফিস করি। জাগা অবস্থায় যতক্ষণ দেখে ততক্ষণ দেখতে পায় যে, হয় ফোন করছি, না হয় বস্তা বস্তা প্রেস রিলিজ পড়ছি কিংবা দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি বা গুলিবিনিময় না হলে সমাবেশ দেখতে নয়তো প্রেস কনফারেন্সে ছুটছি। এরপর টাইপ-রাইটারে লিখছি, না হয় লন্ডনে সম্পাদকদের ফোনে নিউজ দিচ্ছি। রেণুর কথা হলো—‘এতই যদি দেখো আর শোনো আর রিপোর্ট করো, তাহলে বই লিখতে পারবে না কেন?’ যায়যায়দিনে একালের বয়ানে প্রকাশিত লেখা নিয়েই বইটি প্রকাশিত হয়। এ বই নিয়ে তিনি লেখেন—‘ইউপিএলের মহিউদ্দিন ভাই আমাকে গ্রন্থকার করে ফেললেন। একদিন ফোন করে বললেন, তিনি আমার কিছু বয়ান একত্র করে পড়ে দেখেছেন যে, এগুলো এখন একসঙ্গে বই হিসেবে প্রকাশ করা যায়। আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ আমার একটা বই বের হলে রেণু খুশি হবে।’